মহাসড়কে চলছে রেস নৈরাজ্য, ঝরছে প্রাণ

টুয়েন্টিফোর টিভি
প্রকাশিত : সোমবার, ২০২২ সেপ্টেম্বর ২৬, ০২:০১ অপরাহ্ন

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর। এরপর মধ্যরাতের ওই দুর্ঘটনার কিছু ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যে বাসটি দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে সেই বাস এবং তার পেছনে থাকা অপর একটি বাস থেকে চালককে উসকানি দিয়ে রেসের ভিডিও করা হয়। বিষয়টি সামনে আসার পর দেশের পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি প্রতীয়মান হয়েছে তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকৃতির।

জানা যায়, ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা থেকে বান্দরবানে ঘুরতে যান কিছু তরুণ। যারা বাস লাভার নামে পরিচিত এবং তাদের ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ ‘বিডি বাস জোন’ ওই ট্যুরের আয়োজন করে। ৪৫ জন সদস্যের ওই গ্রুপটি হানিফ এন্টারপ্রাইজ থেকে ট্যুরের জন্য একটি বাস ভাড়া নেয়। ট্যুর শেষে ১৬ তারিখ শুক্রবার রাতে ওই বাসটি নিয়ে তারা ঢাকায় ফিরছিল। শুরু থেকেই বেশ বেপরোয়া ছিলেন সদস্যরা। তারা বাসের ইঞ্জিন কাভারে (বনেট) বসে চালককে দ্রুতগতিতে যাওয়ার জন্য উসকানি দিতে থাকেন বলে জানা যায়।


কয়েকজন ট্যুর সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত ৩টার দিকে বাসটি যখন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় আসে, তখন তারা ইমাদ পরিবহনের একটি বাস দেখতে পান। ওই বাসটিও ছিল ট্যুরের। ইমাদ পরিবহন অফিশিয়াল ফেসবুক গ্রুপের সদস্যরা কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। ওইদিন একসঙ্গে বিভিন্ন গ্রুপের ছয়টি বাস ঢাকায় ফিরছিল। এরপরই হানিফ আর ইমাদ পরিবহনের দুটি বাসের মধ্যে কে কার আগে যাবে, তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা।

বাস থামিয়ে ‘ফেয়ার খেলা’র আহ্বান

এভাবে দুই বাসের প্রতিযোগিতা চলার একপর্যায়ে হানিফের বাসে থাকা ট্যুরের সদস্যদের কথামতো চালক সজল ইমাদের বাসের চালককে হাত দিয়ে ইশারা দেন বাসটি থামানোর জন্য। তখন ইমাদের সামনে থাকা ট্যুরের সদস্যদের কথায় বাসের চালক হানিফের পাশে বাসটি থামান। তখন হানিফ থেকে তাদের ‘ফেয়ার খেলা’র আহ্বান জানানো হয়। এতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন ইমাদ পরিবহনে থাকা সদস্যরা। তারা চালককে দ্রুত বাস চালাতে বলেন এবং আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। কিন্তু দুটি বাস চলতে শুরুর পরই ইমাদের সামনে একটি লরি থাকায় হানিফের বাসটি বাম লেন থেকে আগে চলে যায়।  এরপর আবার হানিফ গতি একটু কমিয়ে দিলে ইমাদ আগে চলে যায়।
 

 

No description available.

চলার পথে বাস থামিয়ে ‘ফেয়ার খেলা’র আহ্বান জানাচ্ছেন হানিফ এন্টারপ্রাইজের চালক। ভিডিও থেকে নেয়া ছবি।


একপর্যায়ে হানিফের ওই বাসটি আবার ইমাদ পরিবহনের বাসকে ওভারটেক করে সামনে চলে আসে। তখনকার ভিডিও থেকে দেখা যায়, হানিফের ওই বাসের সামনে ছিল একটি মালবাহী ট্রাক। আর বাসটি কোনো কারণ ছাড়াই ‘বাউলি’  দিচ্ছিল। (আরেকটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে বাস যখন দ্রুতগতিতে একাধিকবার লেন বদল করে, পরিবহন শ্রমিকদের ভাষায় তাকে বলে ‘বাউলি’)। আর ট্রাকটিকে ওভারটেক করতে হর্ন দেয়ার পাশাপাশি ‘ডিপার’ (সামনে থাকা বা বিপরীত দিক থেকে আসা কোনো যানবাহনের চালককে সংকেত দিতে হেডলাইটের ব্যবহার) দিচ্ছিল হানিফের চালক সজল।


ডিপার দেখে সামনে থাকা ট্রাকটি প্রথমে হালকা ডানে চাপ দিলেও পরে আবার বাম লেনে চাপতে থাকে। ঠিক তখনই ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে থাকা হানিফ এন্টারপ্রাইজের ওই বাসাটি ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাসের বাম পাশের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। যদিও তাতে কেউ গুরুতর আহত হননি। কিন্তু ট্রাকটি মুহূর্তেই সড়কে উল্টে যায়। বিষয়টি দেখার পরও ওই বাসের সামনে থাকা তরুণরা বাসটি না থামিয়ে বা আহত ট্রাকচালক-হেলপারকে উদ্ধার না করে বাসচালককে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বলেন।


এদিকে দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে পেছনে থাকা ইমাদ পরিবহনের বাসে থাকা ট্যুরের অন্য সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন হানিফে থাকা ‘বিডি বাস জোন’-এর সদস্যদের ফোন করে নিশ্চিত করেন ট্রাকের চালক-হেলপার বেঁচে আছেন। এতে হানিফ বাসে থাকা ট্যুরের সদস্যরা স্বস্তি পান এবং দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন–এমনটাই জানান পরিচয় গোপন রাখার শর্তে হানিফ পরিবহনে থাকা ‘বিডি বাস জোন’-এর এক সদস্য।


যদিও ১৫ তারিখ ট্যুরে যাওয়ার আগে এই দুটি গ্রুপের সদস্যরা ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং একে অন্যকে ট্রল করেছে। এমনকি চালকের নাম লিখেও তারা এক গ্রুপ অন্য গ্রুপকে উসকানি দিয়েছে। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ সময় সংবাদের হাতে আছে। শুধু ওই ট্যুরেই যে এমন হয়েছে তা নয়, মাঝে মাঝেই তারা এমন ট্যুরের আয়োজন করে শুধু কোন গ্রুপের চালক কতটা ‘পাঙ্খা’ এবং কোন কোম্পানির বাস গতিতে সেরা সেটা প্রমাণের জন্য।


কিন্তু প্রতিযোগিতা করেননি বলেই দাবি করেছেন ট্যুরের অন্যতম সংগঠক এবং ‘বিডি বাস জোন’-এর অ্যাডমিন ইমরান ইমু। তারা প্রতিবছরই এমন ট্যুর করে থাকেন। কখনোই এমন ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এবার দুর্ঘটনা হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি বড় হয়েছে বলে দাবি তার।


একই রকম দাবি করেন শুভ নামে অপর এক সদস্য। মিরপুরের এ বাসিন্দা জানান, ওইদিন চালককে কেউ উসকানি দেয়নি। তিনি তার মতোই চালাচ্ছিলেন। শুধু তাই নয়, দুর্ঘটনার সময় বাসের গতি ঘণ্টায় মাত্র ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।


দুর্ঘটনার জন্য ট্রাকের চালককে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘ট্রাক প্রথমে মাঝামাঝি লেনে ছিল আর আমাদের বাস বাম লেনে। কিন্তু ওভারটেক করার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাকটি প্রথমে হালকা ডানে এবং পরে বাম লেনে চাপতে থাকলে আমাদের চালক ‍দুর্ঘটনা হবে বুঝতে পেরে ডান লেনে বাউলি দিয়ে বের হয়ে যেতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।’


যদিও ঘটনার সময়ের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হানিফ এন্টারপ্রাইজের বাসটির দ্রুতগতির কারণেই এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। যদিও দুর্ঘটনার পর সমালোচনা শুরু হলে ওই সংক্রান্ত ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলেছেন আপলোডকারীরা। এমনকি নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য গড়ে তোলা মেসেঞ্জার গ্রুপেও ওইসব ভিডিও কোথাও না ছাড়তে সতর্ক করা হয়েছে এবং কিছুদিন এমন রেসিং ভিডিও না দিতে ও ট্যুর না দিতেও অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপে যদি কেউ অ্যাডমিন বা মডারেটর থেকে থাকেন, তাহলে তাদের ওইসব গ্রুপ থেকে বের হয়ে যেতে অনুরোধ করেছেন ইমরান ইমু। বলেছেন, এখন আর বাস লাভিং করতে হবে না, একসঙ্গে বসে আড্ডা দেয়া আর চা খাওয়ার সময় সব বিষয়ে কথা হবে। যার স্ক্রিনশটও সময় সংবাদের হাতে এসেছে।


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ।

 

No description available.


‘ওরা উড়ে’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে ভয়ংকর এই বাস দুর্ঘটনার ভিডিও শেয়াà¦